ফিলিস্তিনের গল্প: নদী থেকে সাগর পর্যন্ত—একটি স্বাধীনতার সংগ্রাম
এক পবিত্র ভূমির ইতিহাস
ফিলিস্তিন একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অঞ্চল, যার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। এই ভূমি বহু সভ্যতা, রাজত্ব ও জাতির আবাসস্থল ছিল—কানানীয়, রোমান, বাইজান্টাইন ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ ছিল ফিলিস্তিন।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই ভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে জেরুজালেম শহর, যেখানে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ, যা ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান। এখান থেকেই রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) মেরাজে গিয়েছিলেন।
নাকবা: একটি ভয়াবহ বিপর্যয়
১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের জন্ম ঘোষণার সময়, ফিলিস্তিনে ঘটেছিল “আল-নাকবা” (বিপর্যয়)। ইহুদি বসতির জন্য ব্রিটিশ সরকার ব্যালফোর ঘোষণা (১৯১৭) এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে প্রস্তুত করতে শুরু করে। এতে ফিলিস্তিনি জনগণের জমি দখল ও স্থানচ্যুতি শুরু হয়।
ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার ফলে, প্রায় ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হন। শত শত গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে—জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, গাজা, পশ্চিম তীরে আশ্রয় নেয়।
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণ শুরু করে প্রতিরোধের সংগ্রাম, যা আজও চলছে।
দখলদারি ও প্রতিদিনের দুঃখকষ্ট
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ-এর পর ইসরায়েল দখল করে নেয় পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজা উপত্যকা। এরপর থেকেই ফিলিস্তিনিরা বাস করছে এক ভয়াবহ দখলদারিত্বের মধ্যে, যেখানে তারা ভোগ করছে:
- অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন
- সেনা চেকপোস্ট ও চলাচলের বাধা
- বিচার ছাড়াই বন্দিত্ব (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন)
- বাড়িঘর ধ্বংস
- নিয়মিত বোমা হামলা ও সামরিক অভিযান
গাজা উপত্যকা, যাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় “খোলা-আকাশের কারাগার,” সেখানে প্রতিনিয়ত ইসরায়েলি বোমা বর্ষণ, খাদ্য ও ওষুধের অবরোধ, বিদ্যুৎ সংকট এবং পানির অভাব। অন্যদিকে, পশ্চিম তীর জুড়ে বসতিস্থাপন ও সেনা চেকপোস্টে বিভক্ত হয়ে গেছে ফিলিস্তিনিদের জীবন।
কিন্তু এই দমননীতি কখনও ফিলিস্তিনিদের আত্মার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দমন করতে পারেনি।
আজকের মুসলিম বিশ্ব কী জানে?
আগে হয়তো বিশ্ব মিডিয়া বা শাসকগোষ্ঠীর কারণে অনেক তথ্য গোপন থাকত। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা রোজ ফিলিস্তিনিদের বাস্তবতা দেখতে পাই। তাই আজকের মুসলিম বিশ্ব জানে:
💡 সত্য আর লুকানো নেই
আমরা নিজের চোখে দেখি—শিশুদের মৃতদেহ, বিধ্বস্ত ঘর, কান্নারত মা, শহীদ বাবা। ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের এই কষ্টের গল্প প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে।
💡 নীরবতা মানে অপরাধে অংশগ্রহণ
আজ চুপ করে থাকা মানে দখলদারের পাশেই দাঁড়ানো। ফিলিস্তিনের শিশুর রক্তে হাত রাঙানোর অংশীদার হওয়া। মুসলিম দেশগুলোকে কেবল নিন্দা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
💡 ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মজলুমের পাশে দাঁড়াও
“তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে না কেন, সেই মজলুমদের জন্য, যারা নারী, শিশু ও দুর্বল মানুষ…”
(সূরা নিসা: আয়াত ৭৫)
এই আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—অত্যাচারিতদের পাশে দাঁড়ানো মুসলমানের ঐশী দায়িত্ব।
“নদী থেকে সাগর পর্যন্ত—ফিলিস্তিন হবে স্বাধীন” এর অর্থ কী?
এই স্লোগান কোনো উগ্রতার বার্তা নয়। এটি একটি আদর্শিক প্রতিজ্ঞা—যেখানে জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সমস্ত ফিলিস্তিনি জমিতে:
- দখলমুক্ত স্বাধীনতা ফিরে আসবে
- শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অধিকার থাকবে
- ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে
- শান্তি ও মর্যাদায় বসবাস করতে পারবে ফিলিস্তিনিরা
এই আশাই যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রেরণা ও প্রতিরোধের শক্তি।
আমরা কী করতে পারি?
আমরা যারা বাংলাদেশে বা বিশ্বের অন্য মুসলিম দেশে বসবাস করছি, তারাও এই সংগ্রামের অংশ হতে পারি। কীভাবে?
- সচেতন হোন: সঠিক তথ্য জেনে এবং অন্যদের জানিয়ে দিন
- বর্জন করুন (Boycott): যারা দখলদারদের সাহায্য করে, এমন কোম্পানি বর্জন করুন (BDS আন্দোলন)
- মানবিক সহায়তা দিন: গাজা ও পশ্চিম তীরে জরুরি খাদ্য, ওষুধ ও বাসস্থান সহায়তা পাঠান
- দোয়া করুন: প্রতিদিন সালাতে ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া করুন
- অসংখ্য প্ল্যাটফর্মে আওয়াজ তুলুন: স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলুন
- রাজনৈতিক চাপ তৈরি করুন: আপনার দেশের নেতাদের কাছে চিঠি লিখুন, মিছিল করুন—ইসরায়েলি অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জানান
শেষ কথা: এই যুদ্ধ স্বাধীনতার, সম্মানের, সত্যের
ফিলিস্তিন কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানার নাম নয়। এটি একটি বঞ্চিত জাতির সংগ্রাম—যারা ঘরহীন হয়েও মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শিশুরা পাথর হাতে সেনার ট্যাংকের সামনে দাঁড়ায়।
এই গল্প একটি আন্তর্জাতিক ন্যায়ের প্রশ্ন, একটি মানবিকতার পরীক্ষা।
আজ, পুরো মুসলিম বিশ্ব যদি একবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে সত্যের পাশে দাঁড়ায়, তবে একদিন এই শ্লোগান বাস্তব হবে ইনশাআল্লাহ:
“নদী থেকে সাগর পর্যন্ত, ফিলিস্তিন হবে স্বাধীন।” – From the river to the sea, Palestine will be free